মাঝ আকাশে উধাও বিমান, দ্বন্দ্বশেষে মিলল ধ্বংসাবশেষ

0
98

মাঝ আকাশে উধাও বিমান, দ্বন্দ্বশেষে মিলল ধ্বংসাবশেষ ………

ইন্দোনেশিয়ার নিখোঁজ বোয়িং ৭৩৭-৫০০ মডেল বিমানের খোঁজে তল্লাশি চলাকালীনই উদ্ধার হল ধ্বংসাবশেষ। প্রথমে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি যে সেটি নিখোঁজ বোয়িং ৭৩৭-৫০০ মডেল বিমানেরই ধ্বংসাবশেষ। মাঝ আকাশে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া বিমানটিও ভেঙে পড়ে থাকতে পারে বলেই আশঙ্কা ছিল সবার।

ইন্দোনেশিয়ার এই উড়োজাহাজটি ৬২ আরোহী নিয়ে নিখোঁজ হয়েছিল । শনিবার সুকর্নো-হাত্তা বিমানবন্দর থেকে পশ্চিম কালিমান্তান প্রদেশের পন্টিয়ানাকের উদ্দেশে বোয়িং ৭৩৭-৫০০ মডেলের বিমানটি উড্ডয়নে যাত্রা শুরুর চার মিনিটের মাথায় রেডার থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় বিমানটি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে৷ । সেসময় এটি ১০ হাজার ফুট উচ্চতায় ছিল৷ এ সময় শ্রিভিজায়া এয়ারের ওই বিমানটিতে ৬২ জন আরোহী ছিল।স্থানীয় সময় শনিবার দেশটির রাজধানী জাকার্তা থেকে ওই উড়োজাহাজটি উড্ডয়ন করেছিল। ১ টা ৩৬মিনিট নাগাদ শ্রীবিজয়া এয়ারলাইনের এসজে ১৮২ নম্বর যাত্রীবাহী ওই বিমানটি ওড়ে। বিমান উড়ার চার মিনিটের মাথায় দুপুর ১টা ৪৪ মিনিটে এটি নিখোঁজ হয়ে যায়। আকাশে ১০,৯০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থান করছিল। এখান থেকে বিমানটি খাড়াভাবে নামতে শুরু করার ২১ সেকেন্ড পর সেটি তথ্য পাঠানো বন্ধ করে দেয় ……খবর ওয়াশিংটন পোস্টের।

FlightRadar24 ফ্লাইট ট্র্যাকার ওয়েবসাইট জানিয়েছিল যে, অনেক বৃষ্টির কারণে নির্দিষ্ট সময়ের আধা ঘণ্টা পর রওনা দিয়েছিল উড়োজাহাজটি। কিন্তু উড্ডয়নের পরপরই ফ্লাইট এসজে ১৮২ এর সঙ্গে কন্ট্রোল টাওয়ারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। উড্ডয়নের পর সোজা ১০৯০০ ফুট উপরে উঠে যায় বিমানটি। কিন্তু মাত্র ১ মিনিটের মধ্যে সেখান থেকে ১০০০০ ফুট উচ্চতায় নেমে আসে বিমানটি। তাই বিমানটি ভেঙে পড়ে থাকতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করা হয়েছিল।উড়োজাহজটি কেন হঠাৎ করে নিচের দিকে নামা শুরু করেছিল তখন তার কোনো কারণ জানা যায়নি।
সেই খানের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছিল, অধিকাংশ বিমান দুর্ঘটনার পেছনে অনেকগুলো কারণ থাকে আর সেগুলো খুঁজে বের করতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে।

ইন্দোনেশিয়ার পরিবহন মন্ত্রণালয়ের বার্তা সংস্থা এএফপি শনিবার জানায়, উড্ডয়নের পর থেকেই ইন্দোনেশিয়ার শ্রীউইজায়া এয়ার নিখোঁজ রয়েছে। দেশটির পূর্ব কালিমানটান রাজ্যের পনটিয়ানাকের উদ্দেশে উড়োজাহাজটি রওনা হয়েছিল। ওই গন্তব্যের যাত্রাপথ ৯০ মিনিট ছিল। চার মিনিট পরই কন্ট্রোল রুম থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় উড়োজাহাজটির।

রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বুদি কারিয়া, ইন্দোনেশিয়ার পরিবহন মন্ত্রী জানান, বিমান বন্দর থেকে ২০ কি.মি. দূরে সাগরে বিধ্বস্ত হয় শ্রীবিজয়ার উড়োজাহাজটি মনে করা হচ্ছে এটি লাকি দ্বীপের কাছে । ভূস্থল থেকে ১০ হাজার ফুট উচ্চতায় থাকাকালীন অবস্থায় বিমানটির সঙ্গে শেষ বার যোগাযোগ করতে পেরেছিল কন্ট্রোল রুম। তার পর আর কোন সংকেত পাওয়া যায়নি।

এয়ারলাইন থেকে এক বিবৃতিতে রবিবার জানানো হয়েছিল, যাত্রীদের মধ্যে সাতটি শিশু ও তিনটি নবজাতকও ছিল বিমানে মোট নারীপুরুষ মিলিয়ে ৫৯ জন যাত্রী ছিলো তাদের মধ্যে নবদম্পতিও রয়েছে বলে জানা যায়। তাদের মধ্যে ছিল একটি নবজাতক শিশু। বিমানটির খোঁজে তল্লাশি শুরু হয়েছে।ওই ডমেস্টিক ফ্লাইটে ১২জন ক্রুসহ মোট ৬২ জন আরোহী ছিলেন। তাদের সবাই ঐ দেশের নাগরিক বলে দেশটির ট্রান্সপোর্ট সেফটি কমিটি জানিয়েছে।

হাইরুল আনোয়ার বিমান বন্দর সুকর্নো-হাত্তার মুখপাত্র রবিবার বলেছেন, সুকার্ন-হাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল নিখোঁজ হওয়ার কয়েক সেকেন্ড আগে উড়োজাহাজটির পাইলটকে জিজ্ঞেস করেছিল ফ্লাইটটি প্রত্যাশিত পথ ছেড়ে উত্তরপশ্চিমের দিকে কেন যাচ্ছে। ল্যানক্যাং দ্বীপের কাছকাছি যাওয়ার পর নিয়ন্ত্রণ কক্ষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় প্লেনটির সাথে ৷
স্থানীয় গণমাধ্যমে দেখা যায়, সমুদ্র থেকে কিছু ভগ্নাংশ উদ্ধারের ছবি প্রচার করা হয়েছিল ৷ CNN ইন্দোনেশিয়া ডটকমকে জুলকিফ্লি নামের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা তথ্য জানিয়েছিল যে , “আমরা পানিতে কিছু তার, কয়েক টুকরা জিন্স ও ধাতুর টুকরা পেয়েছি,”।

মেট্রো টিভির মাধ্যম দিয়ে জাকার্তা ভিত্তিক টিভি চ্যানেল তুরস্কের সংবাদ মাধ্যম ডেইলি সাবাহ কে জানিয়েছিল যে, এরিইমধ্যে জাতীয় অনুসন্ধান ও উদ্ধার সংস্থাগুলো এবং জাতীয় পরিবহন নিরাপত্তা কমিটি সকল ধরনের তদন্ত শুরু করেছে।
উদ্ধারকারী সংস্থা বাসারনাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল যে, বিধ্বস্ত উড়োজাহাজটির আরোহীদের খোঁজে হাজার দ্বীপের ওই এলাকাটিতে তারা একটি দল পাঠাবে।

ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী নিখোঁজ উড়োজাহাজটির বিধ্বস্ত হওয়ার স্থানটি সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করে সেখানে জাহাজ পাঠিয়েছে বলে নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তা জানিয়েছিল । তবে সেখানে কেউ বেঁচে আছেন বলে বিশ্বাস করে কিনা, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো মন্তব্য করেনি। দেশটির নৌবাহিনীর ডুবুরিরা আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন যে তারা সোমবার উদ্ধারকাজ পুনরায় শুরু হওয়ার পর বিমানের দুটি ব্ল্যাক বক্সই উত্তোলন করতে পারবেন। ব্ল্যাক বক্স বা ফ্লাইট রেকর্ডার হল উড়োজাহাজের ককপিটে যা কথা হয় এবং উড়োজাহাজের গতিবিধি সম্পর্কিত সকল তথ্য রেকর্ড করে। এগুলো উড়োজাহাজের দুর্ঘটনা তদন্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্লাইট শুরুর আগে উড়োজাহাজটি ভালো অবস্থায় ছিল বলে এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছিলেন, শ্রীবিজয়া এয়ারের প্রধান নির্বাহী জেফারসন ইরউইন জওউয়েনা। কিছু সংকেত রোববার পাওয়া যায়। মনে করা হচ্ছিল , সংকেতগুলো বিমানটির ফ্লাইট রেকর্ডার থেকে আসছে , ডুবুরিসহ নৌবাহিনীর দশটির মতো জাহাজ এখন দুর্ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়েছিল ।

“আমরা ২টি কেন্দ্র পয়েন্ট থেকে সংকেত পেয়েছি।ধারনা করছি সেটা ব্ল্যাক বক্সের ও হতে পারে” ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী সংস্থার প্রধান এয়ার মার্শাল বাগুস পুরুহিতো বলেন ।

ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীর কর্মকর্তা ওয়াহিউদ্দিন আরিফ আইনিউজকে জানিয়েছেন, কিছু সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষ এরইমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে, যেগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে , ধ্বংসাবশেষগুলো বিমানের অংশবিশেষ । মনে করা হচ্ছে , বিমানের একটি ইঞ্জিনের টারবাইন ফিউসিলেজ বা বিমানটির লেজের দিকের কিছু অংশ রয়েছে এবং অংশের একটি চাকা রয়েছে । তারা উড়োজাহাজের কাঠামোর টুকরা পেয়েছেন যেটি প্রায় এক মিটার লম্বা, পাশাপাশি চাকা, টায়ারের টুকরা ও মানব দেহের অঙ্গও পেয়েছেন।

ইউস্রি ইউনুস জাকার্তা পুলিশের মুখপাত্র জানিয়েছেন, অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী সংস্থারগুলোর কাছ থেকে দুটি ব্যাগ পাওয়া গেছে এবং তারা গ্রহণ করেছেন। “১ম ব্যাগে যাত্রীদের জিনিষপত্র ছিল, অন্য ১টি ব্যাগে দেহাবশেষ ছিল,” তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, “এসব থেকে আমরা কিছু সনাক্ত করার চেষ্টা করছি।” বৈরী আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার কর্মীরা শনিবার রাতে উদ্ধার প্রচেষ্টা স্থগিত করলেও রবিবার খুব সকাল থেকেই আবার তারা উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। চারটি উড়োজাহাজ উদ্ধার অভিযানে মোতায়েন করা হয়েছিল ।

উড়োজাহাজটি ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের ছিল না বলে জানা গেছে । ২০১৯ সালে পরপর দুইটি বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটে , তাই ২০১৯ সালের মার্চ থেকেই গত ২০২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বোয়িংয়ের ওই মডেলের বিমানগুলোর উড্ডয়ন বন্ধ রাখা হয়। ইন্দোনেশিয়ার সকল টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ধ্বংসাবশেষের ছবি দেখানো হয়েছে।
বিবিসিকে স্থানীয় একজন জেলে জানিয়েছেন যে, অন্তত একটি বিস্ফোরণ হতে দেখেছেন তিনি।আস্তে আস্তে মানবদেহের খণ্ডাংশসহ উড়োজাহাজের ধ্বংসাবশেষ এবং আরোহীদের জিনিসপত্র পানিতে ভেসে উঠতে শুরু করে।

বিমান যাত্রীদের জন্য উদ্বিগ্ন ও বিপর্যস্ত স্বজনরা তারা জাকার্তা থেকে প্রায় ৭৪০ কি.মি. দূরে পনতিয়ানাতে অপেক্ষা করছেন বলে জানা গেছে, নিজ নিজ স্বজনদের জন্য অনেকেই ভেঙ্গে পড়েছে । স্বজনদের একজন ইয়ামান জাই। কান্নাজিড়ত কণ্ঠে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘ফ্লাইটে তার পরিবারের সদস্য চারজন ছিলেন। তার স্ত্রী এবং তার ৩ সন্তান। তার স্ত্রী শনিবার তার বাচ্চার একটি ছবি তাকে পাঠিয়েছিল… ”

আজ সুরিয়ান্ত তাইয়োনো ইন্দোনেশিয়ার পরিবহন নিরাপত্তা কমিটির প্রধান বলেন, ‘‘আমরা সমুদ্রের গভীরে ব্ল্যাকবক্সগুলোর অবস্থান শনাক্ত করেছি। দুটিই পেয়েছি।” “এখন ডুবরিরা সেগুলোর উদ্ধারের কাজ শুরু করবেন। আশা করি সেগুলো উদ্ধারে আমাদের খুব বেশি সময় লাগবে না।”
এদিকে জনাথন হেড বিবিসি’র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিনিধি জানান, উড়োজাহাজটি যেখানে বিধ্বস্ত হয়েছে সেখানে সমুদ্র অনেক গভীর নয়। শুরুতে খারাপ আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার অভিযানে অসুবিধা হচ্ছিল। এখন আবহাওয়াও অনেকটা ভালো হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here