অর্ধ শতাব্দী পর চালু হল হলদিবাড়ি-চিলাহাটি ট্রেন

0
56

আজ শুরু হতে যাচ্ছে ভারতের হলদিবাড়ি ও বাংলাদেশের নীলফামারীর চিলাহাটির মধ্যে বন্ধ থাকা রেল পরিষেবা দীর্ঘ ৫৫ বছর প্রতীক্ষার পর শুরু হতে চলেছে এই রেল যোগাযোগ । ৫৫ বছর পর শুরু হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেলপথ , দুই দেশ আবারও এটি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে । গত শনিবার , ওই রেলপথে ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও কাজের উদ্বোধন করেছেন রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন। আজ  বৃহস্পতিবার (১৭ ডিসেম্বর) থেকেই চলবে রেলটি। প্রথমে পণ্যবাহী ট্রেন চলবে এবং  আগামী ২৬ মার্চ থেকে এ রেলপথটি দিয়ে ঢাকা থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলের পরিকল্পনা রয়েছে সবার।

বাংলাদেশের রেলপথমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের নীলফামারীর চিলাহাটি ও ভারতের হলদিবাড়ি হয়ে পুরোনো যে রেললাইনটি ছিল, সেইটা ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই রেলপথটি পুনরায় চালুর কার্যকর্ম শুরু হয়েছে আজ।

এই রেলপথে দুই বাংলার সংযোগ স্থাপনের সময় ঘিরে চিলাহাটি রেলস্টেশন সেজেছে অপরূপ সাজে। গত  শনিবার দুপুরে , চিলাহাটি রেলস্টেশন চত্বরে এ উদ্বোধন কার্যক্রম উপলক্ষে এক বিশেষ সভা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। মো. মজিবর রহমান বর্তমান বাংলাদেশের রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন । আগামী জুন মাসের মধ্যে এই রেলপথ নির্মাণের সব কাজ শেষ হবে বলে আশা করা যায় অনুষ্ঠানে তিনি বলেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) একটি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আজ বৃহস্পতিবার (১৭ ডিসেম্বর) সকাল ১১.৩০ মিনিটের দিকে  দুই দেশের রেল যোগাযোগের উদ্বোধন করেছেন । প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ও মোদির মধ্যে ভার্চুয়াল বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে চারটি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বেলা  ১১.৩০ মিনিটে  ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রায় ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট ব্যাপী বৈঠকে দুই দেশেরই বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেছেন তারা।

ভারতীয় হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলী দাস বলেন, রানাঘাট, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, সান্তাহার, হিলি,ভেড়ামারা, পার্বতীপুর, হলদিবাড়ি, শিয়ালদহ, নীলফামারী, চিলাহাটি,   শিলিগুড়ি হয়ে আসবে । এইসব পথে আগে একটা ট্রেন চলত যা ‘দার্জিলিং মেইল’ নামে পরিচিত ছিল। সেই ‘দার্জিলিং মেইল’ অনুস্মরণে এই পথে আবারও শুরু হতে যাচ্ছে দুই দেশের মধ্যে রেল যোগাযোগ। এটি হচ্ছে বর্তমান সময় উপযোগী এবং জরুরি একটি উদ্যোগ।

রীভা গাঙ্গুলী আরও বলেন, ‘আমাদের দুই দেশের বর্তমান সম্পর্কে সোনালি অধ্যায় চলছে। এই পথের মাধ্যমে আমরা আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারসহ  বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে।’

বাংলাদেশের জেলা নীলফামারী-২ সদর আসনের সংসদ সদস্য ও রেলপথ বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আসাদুজ্জামান নূর বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতার আসার পর থেকে রেল যোগাযোগে প্রাণসঞ্চার হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এই রেলপথকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এই রেলপথের মাধ্যমে আমাদের দুই দেশের সম্পর্ক আরও উচ্চতায় পৌঁছাবে।

ঢাকায় আমাদের বিদেশ মন্ত্রক সূত্র জানায়, বৈঠকের আগেই বাংলাদেশ ও ভারত দু’দেশের মধ্যে চারটি সমঝোতা চুক্তি সইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। বৈঠক শেষে  আনুষ্ঠানিকভাবে এসব চুক্তি ঘোষণা করা হবে। যে চারটি চুক্তি সইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো হলো-

বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতা, দুই দেশের মধ্যেই হাতি সংরক্ষণ সহযোগিতা, বরিশালে একটি পয়ঃনিষ্কাশণ প্ল্যান্ট তৈরি ও কমিউনিটি উন্নয়ন প্রকল্প। ওই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি বড় পর্দায় দেখানো হবে বাংলাদেশের নীলফামারীর  চিলাহাটিতে স্থাপিত প্যান্ডেলে। সেখানে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশের রেলমন্ত্রী মহম্মদ নূরুল ইসলাম সুজন।

জেলা প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, নীলফামারীর চিলাহাটি রেলস্টেশন থেকে ভারতের সীমান্ত পর্যন্ত ৬.৭২৪ কি.মি. ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণে সরকারের ব্যয় হচ্ছে ৮০ কোটি ১৬ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। ওই প্রকল্পে রেললাইন স্থাপন ছাড়াও বসানো হয়েছে চার কিলোমিটার লুপ লাইন, আটটি লেভেলক্রসিং ও ৯টি ব্রিজ-সহ অন্য পরিকাঠামো।

এই অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন জেলা নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য আফতাব উদ্দিন সরকার, সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য রাবেয়া আলীম, পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক মো. হারুন অর রশীদ আরও অনেকে।

গত ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের নীলফামারী জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত হয় এই রেলপথ উদ্বোধনের প্রস্তুতিমূলক সভা। ওই সভায় রেলপথমন্ত্রী মহম্মদ নূরুল ইসলাম সুজন জানিয়েছিলেন, উদ্বোধনের পর থেকে এ পথে আপাতত শুধুমাত্র দুই দেশের মধ্যে পণ্যবাহী ট্রেনগুলো চলাচল করবে। আগামী ২৬শে মার্চ থেকে এই পথটি দিয়ে ঢাকা থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত যাত্রীবাহী ট্রেনগুলোও  চলাচলের পরিকল্পনা রয়েছে সবার। এরপর ভারত–বাংলাদেশ ট্রেন চলাচল পুনঃস্থাপন সম্ভব হবে বলে ধারনা করা হচ্ছে ।

ধারনা করা হয়, ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত ভারতের  যোগাযোগের অন্যতম  মাধ্যম রেলপথ ছিল চিলাহাটি-হলদিবাড়ী। এই পথ দিয়ে নিয়মিত চলাচল করত ট্রেন, দার্জিলিং থেকে খুলনা হয়ে কলকাতা পর্যন্ত একাধিক যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন নিয়মিত চলাচল করত ।  ওই সময় এই রেল যোগাযোগকে ঘিরে চিলাহাটিতে গড়ে  ওঠে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সে সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীদের আনাগোনায় মুখরিত ছিল চিলাহাটি, চিলাহাটিতে  তখন গড়ে উঠেছিল মার্চেন্ট সমিতি।

সেই মার্চেন্ট সমিতির হাত ধরেই  হয়েছিল এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়ন। তারই নিদর্শন হিসেবে রয়েছে চিলাহাটি মার্চেন্ট উচ্চ বিদ্যালয়। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর পথটি বন্ধ করে দেওয়া হলে বন্ধ হয়ে পড়ে নীলফামারী-সহ আশপাশের জেলার ব্যবসা-বাণিজ্য। সেই থেকে ফের রেলপথ চালুর দাবি তোলে অনেক এলাকাবাসী। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ ৫৫ বছর পর রেলপথটি ফের চালুর উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের সরকার।

একটি সূত্র থেকে জানা যায় যে, গত আগস্ট মাসেই রেলপথ নির্মাণের জরিপ শেষ হয়েছিল, ভারতের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ রেলওয়ে চিলাহাটি থেকে সীমান্ত পর্যন্ত ৬.৭২৪ কি.মি. । ২.৩৬ কি.মি. লুপ লাইনসহ ৯.৩৬ কি.মি.  রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে বাংলাদেশ অংশে বলে জানা যায় । অন্যদিকে, ভারতের হলদিবাড়ি থেকে হলদিবাড়ি বাংলাদেশের সীমান্ত পর্যন্ত ৬.৫ কি.মি. রেল যোগাযোগ পথ স্থাপনের কাজ এরমধ্যেই শেষ করেছে ভারতীয় রেলওয়ের কর্তৃপক্ষরা।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশে এরই মধ্যে পরীক্ষামূলক ট্রেন চালানো হয়েছিল বলে জানা যায় । অন্যদিকে ভারতের হলদিবাড়ি থেকে বাংলাদেশের আসার সীমান্ত পর্যন্ত ৩ কি.মি. রেললাইন স্থাপন-সহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণকাজ ভারত শেষ করে এবং তাদের অংশে চালিয়েছে পরীক্ষামূলক ট্রেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ঘিরে তাদের অংশেও নেওয়া হয়েছে নানা প্রস্তুতি। এর মধ্যে বাংলাদেশ প্রবেশদ্বারে রেলপথের ওপর স্থায়ী তোরণ স্থাপন করা হয়েছে ।

আজ ভারত ও বাংলাদেশ দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধন ঘোষণা করার পর বাংলাদেশের নীলফামারীর চিলাহাটির রেলস্টেশন থেকে একটি পণ্যবাহী ট্রেন ছেড়ে যাবে, যা ভারতের হলদিবাড়ির দিকে যেয়ে পৌঁছাবে। ওই ট্রেনে থাকবে ভারতীয় ৩২টি খালি ওয়াগন। সেই পণ্যবাহী ট্রেনকে টেনে নিয়ে যাবে বাংলাদেশেরই একটি রেলওয়ের ইঞ্জিন। এসব ওয়াগানগুলো ভারতের হলদিবাড়ি রেলস্টেশনে রেখে ফের সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে ফিরে আসবে ঐ ইঞ্জিনটি।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here