বুধবার, ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০৬:২৫ অপরাহ্ন

বাঙালি সেনাদের আরেকটি গৌরভ গাঁথা, নাফ যুদ্ধ, বাংলাদেশ বনাম মিয়ানমার, কি হয়েছিলো সে দিন?

নিজস্ব প্রতিবেদক :
  • সময় কাল : রবিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৬৬৫ বার পড়া হয়েছে।
Spread the love

প্রায়ই আমরা এই ধরনের খবর শুনতে পাই যে, মিয়ানমার বাংলাদেশের কক্সবাজার কিংবা বান্দরবন সীমান্তে সেনা প্রস্তুত করে রেখেছে। আবার কখনও কখনও সেন্টমার্টিন দ্বীপকে নিজেদের এলাকা বলে দাবী করে ভিন্ন ভিন্ন পোস্ট দেয় মিয়ানমারের ওয়েবসাইটে বা ফেসবুকে। তখন বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং ইউটিউব চ্যানেলে গবেষণা শুরু হয়ে যায়, বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মধ্যে যুদ্ধ লাগলে কারা জিতবে, কার সামরিক সক্ষমতা কেমন, কার ভাণ্ডারে কি কি অস্ত্রে পরিপূর্ণ আর কি পরিমান গোলাবারুদ আছে- এসব নিয়ে। কিন্ত অনেকেই আমরা জানি না বা ভুলে যাই যে, যুদ্ধ আসলে শুধু অস্ত্র বা গোলাবারুদ দিয়ে জেতা যায় না, যুদ্ধ জিততে লাগে মনোবল, থাকতে চৌকশ মস্তিস্কের জোর ও অদম্য সাহস। দেশপ্রেম, সাহস আর তুখোড় বুদ্ধির প্রমাণ বাংলাদেশের সেনাবাহিনী এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি এর আগেও দিয়েছে, ২০০০ সালে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মধ্যে হওয়া নাফ যুদ্ধ যার চরম নিদর্শন। সেই যুদ্ধে ছয়শো সেনার লাশ ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল মিয়ানমারের ভীতু কাপুরুষ সেনাবাহিনী, অন্যদিকে বাংলাদেশকে হারাতে হয়নি একটি প্রাণও। প্রিয় দর্শক, আজ সেই নাফ যুদ্ধের সত্যি গল্পই আপনাদের শোনাব। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি সদস্যদের অসীম বীরত্বগাঁথা রচিত হয়েছিল যে যুদ্ধে।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার যখনই কোনো অস্থিরতার কথা হয় তখন আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে উঠে আসে নাফ যুদ্ধের কথা। ২০০০ সালের ৮ জানুয়ারি এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। ৩ দিনের এই সামরিক সংঘাতে নজির বিহীনভাবে বাংলাদেশ সিমান্তরক্ষী বাহিনী ও রাইফেলসের ২৫০০ সৈন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মিয়ানমারের সেনা ও নৌবাহিনীর দুই ডিভিসন সৈন্য দলের সামনে যার সংখ্যা ছিল বাংলাদেশের সৈন্য সংখ্যার প্রায় ১০ গুন অর্থাৎ ২৫০০০। আগেই বলে রাখা ভালো, এখানে কিন্তু বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অংশ নেয় নি। সেনা বাহিনী আসার আগেই বিডিআর এর উচ্চ প্রতাপের মুখে বিড়ালের মতো লেজ গুটিয়ে পালায় মিয়ানমার বাহিনী। আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে নাফ নদীর বেশ লম্বা একটা পটভূমি ছিল। ১৯৬৬ সালে সীমান্ত নিস্পত্তি করনের সময় তৎকালীন পাকিস্তান ও বার্মা সরকার একটি চুক্তিতে উপনীত হয়। এই চুক্তির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নাফ নদী খাতের মাঝের অংশকে দুই দেশের সীমান্ত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। এই নির্ধারণে মিয়ানমারের নাফ নদীতে ১২টি প্রশাখা আছে। চুক্তি অনুযায়ী মিয়ানমার সরকার এই প্রশাখায় এমন কোন পদক্ষেপ নিতে পারতো না যাতে নদীর গতিপথ বা মোহনায় কোন বাধার সৃষ্টি করে। কারন সব কিছুর ঊর্ধ্বে নাফ নদীর খাতের মধ্যস্থানকে আন্তর্জাতিক ভাবে দুই দেশের সীমানা বলে নির্ধারণ করা হয়েছিল। মিয়ানমার সরকার এই চুক্তি অগ্রাজ্য করে ১২ টির মধ্যে ১১ টিতেইবাধ নির্মাণ করে যার ফলে নাফ নদীর মোহনা পরিবর্তন হয়ে বাংলাদেশের দিকে সরে আসে এতে করে বাংলাদেশ প্রায় আড়াই হাজার একর ভূখণ্ড হারিয়ে ফেলে। ২০০০ সালে শেষ শাখাতেও মিয়ানমার বাধ দিতে চাইলে দু-দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে পাতানো বাদের সুত্রপাত হয়। কয়েক দফা দুই দেশের মধ্যে অকথ্য ভাষায় চিঠি চালাচালিও হয়। মিয়ানমার পরিকল্পিত এই বাধ যদি নির্মাণ হয়ে যায় তাহলে নাফ নদীর যে অংশে বাংলাদেশ আছে সেই অংশে ভাঙ্গনের সৃষ্টি হতো। আর সেই ভাঙ্গন বিলীন করে দিত টেকনাফ শহরের অস্তিত্ব। ১৯৯৯ সালে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করা হয় কিন্তু যখন আলোচনার সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় তখন জোড় প্রয়োগের মাধ্যমে এই বাধ নির্মাণ পরিকল্পনা ভেস্তে দেয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। মিয়ানমারের সেনারা আঘাত হানার জন্য প্রস্তুত হয়। এদিকে গোপন সুত্রে এই হামলার খবর পেয়ে যায় বিডিয়ার বাহিনীও। তারাও নিতে থাকে যুদ্ধের নানান সব প্রস্তুতি। তৎকালীন সময়ে বিডিয়ারের মহাপরিচালক ছিলেন মেজর জেনারেল (অবঃ) আ ল ম ফজলুর রাহমান। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। কাজেই সাহস ছিল বুক ভর্তি। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে যখন অপমান জনক ভাষায় চিঠি এসেছিলো বিডিয়ারের কাছে, তিনিও তখন সৌজন্যতার ধার না ধরে কড়া ভাষায় জবাব দিয়েছিলেন। কারন তিনি জানতেন অসভ্যদের সাথে খেলতে হলে তাদের মতোই হতে হয়। মিয়ানমারের থেকে সামরিক সেনায় পিছিয়ে থাকলেও ফজলুর রহমান জানতেন সঠিক বুদ্ধি ও কৌশল প্রয়োগ করলে ওদের সাথে লড়াই কড়া খুব একটা কঠিন হবে না। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে এক রাতেই মর্টারের গোলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকমের প্রায় ২৫ লাখ গোলা বারুদ তিনি কক্সবাজারে পাঠিয়ে দেন। এর মধ্যে অর্ধেক তিনি কক্সবাজারে রাখার নির্দেশ দেন এবং বাকি অর্ধেক সীমান্তে পাঠানোর আদেশ দেন। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সীমান্তে মোতায়ন করেন। মিয়ানমারের সাথে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো ২০০০ সালের জানুয়ারি মাসের ৮ তারিখ দুপুর আড়াইটায়। জেনারেল ফজলুর রাহমানের নেত্রিত্বে শুরু হওয়া ঐ নাফ যুদ্ধে সেদিন নিয়মিত সিমান্ত পরিদর্শকের অংশ হিসেবে দিনাজপুরে অবস্থান করছিলেন জেনারেল ফজলুর রহমান। যুদ্ধ শুরু করার জন্য তিনি একটি কোড ওয়ার্ড নির্বাচন করেন। সেখান থেকে তিনি ঐ কোড ওয়ার্ডের মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু করার জন্য সীমান্তে মোতায়নরত সৈন্যদের আদেশ দেন। কোড ওয়ার্ডটি ছিল অতি সরল একটি ওয়ার্ড আর সেটা ছিলো বিসমিল্লাহ। যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো টেকনাফের ওয়াই কং ইউনিয়ন সংলগ্ন ইউনিয়নে। এখানে নাফ নদীর একটি বাকের সামনে প্রথম গুলি ছোরা শুরু করে বিডিয়ার। এটি ছিল একটি আক্রমনত্তক এংগেজমেন্ট। দেশি-বিদেশি সকল চ্যানেল খুবই গুরুত্বের সাথে এই নিউজটি প্রকাশ করে। যুদ্ধ শুরুর কিছুক্ষনের মধ্যেই জয় পরাজয়ের সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হতে থাকলো। বাংলাদেশকে একটা বড়সড় ধাক্কা দিতে রেঙ্গুনে বসে মিয়ানমারের সেনারা যে ছক আঁকছিল তা সীমান্তে এসেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। মিয়ানমারে থাকা বাংলাদেশী গোয়েন্দারা সৈন্যদের নানা রকম ক্ষয়ক্ষতির খবর নিয়ে আসে। বাঁধ নির্মাণের শ্রমিক সহ মিয়ানমারের প্রায় ৬০০ সৈন্য নিহত হয় এই আক্রমনে। মিয়ানমারের এই ক্ষয়ক্ষতির পিছনে ছিল জেনারেল ফজলুর রহমানের এক অভিনব প্রক্রিয়া। তিনি এলিমেন্ট অফ সারপ্রাইজ বা ঝুঁকিপূর্ণ এক মাইন্ডগেম খেলছিলেন। ইচ্ছা করেই দুপুরকে আক্রমণের সময় হিসেবে নির্ধারণ করেন। সাধারনত আক্রমণের জন্য সকাল অথবা রাতকে নির্ধারণ করা হয়। দুপুর বেলা আক্রমণ কিছুটা নজিরবিহীন। কারন দুপুরটা এমন একটা সময় যখন শারীরিক ভাবে মানুষের শরীরে একটু শৈথিল্যতা চলে আসে, আলস্য এসে উপস্থিত হয় আর শীতের দুপুরে এই আলস্যতা যেন আরও বেশী জেঁকে বসে। এই পরিকল্পনা সফল হয়েছিল। নিয়মিত রুটিনের বাইরের এই আক্রমনে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলো মিয়ানমারের সৈন্যরা। অথচ মিয়ানমারের মোট সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ২৫০০০ হাজার আর বাংলাদেশের সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র আড়াই হাজার। অর্থাৎ জেনারেল ফজলুর রহমানকে লড়তে হয়েছিলো প্রায় ১০ গুন বেশী সৈন্য বাহিনীর সাথে। তাছাড়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তখনও অংশগ্রহণ করেনি যুদ্ধে। বিডিয়ার বাহিনী একাই লড়েছে। ঘন্টা খানিক যুদ্ধ চলার পরই রেঙ্গুনে থাকা কর্তা বাহিনীর টনক নড়ে। জেনারেল থাং সয়ে তড়িঘড়ি করে রেঙ্গুনে নিযুক্ত বিদেশী চ্যানেল রিপোর্টারদের ও কূটনৈতিকদের ডেকে ঘোষণা করে যে বাংলাদেশের সাথে যুদ্ধের লিপ্ত হবার কোন পরিকল্পনা আমাদের নেই। ভুল বোঝাবুঝি থেকে তৈরি হওয়া সংঘাতের কারণে বাংলাদেশের সাথে নিঃস্বার্থ আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেয়। যুদ্ধের এক তরফা প্রত্যাহারের কারণে ১০ জানুয়ারি যুদ্ধ স্থিমিত করা হয় এবং আলোচনার জন্য বাংলাদেশ থেকে এক দল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মংডুতে উপস্থিত হয়। নাফ যুদ্ধের যে বিরল কৃতিত্ব বিডিয়ার অরজন করে তা হলো শূন্য মৃত্যু হার। ৩ দিনের এই যুদ্ধে মিয়ানমার প্রায় ৬০০ সৈন্যকে হারিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে ছিল শূন্য মৃত্যু হার। গুলিবিদ্ধ হয়েছে অনেকেই কিন্তু কারো মৃত্যু হয় নি। বীরত্বের সূচক হিসেবে তৎকালীন সরকার যুদ্ধের অংশ নেয়া সকল সেনাকে অপারেশন নাফ নামে একটি করে তাম্র পদক প্রদান করে। দেশে প্রথমবার বিডিয়ার সেনাবাহিনীর কোন প্রকার সাহায্য ছাড়াই যুদ্ধের জয় লাভ করে।

মিয়ানমার চীনের বন্ধু হতে পারে। তাদের ভাণ্ডারে আধুনিক অস্ত্র থাকতে পারে। মিয়ানমারের সেনারা চীনের সাথে যৌথ মহড়া করার কারণে অনেক শক্তিশালীও হতে পারে। কিন্তু সম্মুখ যুদ্ধে বাংলাদেশী সেনারা সাহসের সাথে যেভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় তেমনটা মিয়ানমার সেনারা পারে না। আমাদের সার্বভৌমত্তে কেউ আঘাত হানলে ২০ বছর পূর্বে যেমন জবাব দেয়া হয়েছিলো তেমনি মুখভাঙ্গা জবাব দেয়া হবে। নাফ যুদ্ধের তো ৬০০ লাশ গুন্তে হয়েছিলো মিয়ানমারকে। ভবিষ্যতে ঝামেলা করলে আরও বেশী লাশ গুন্তে হবে। এই দেশ রক্তের বিনিময়ে কেনা, সম্ভ্রমের দামে কেনা তাই এই দেশের দিকে কেউ হাত বাড়ালে সেই হাত ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিতে আমরা কার্পণ্য করব না। অনুলিপিটি বিন্দুমাত্রও ভালো লাগলেও শেয়ার করে ছড়িয়ে দিতে অনুরোধ করছি।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ বিভাগের আরও খবর

Advertisement

bangla-news-advertise-here

এই নিউজ পোর্টাল এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ ।
Design & Developed by Online Bangla News
themesba-lates1749691102