ধুম ৩ মুভি দেখে ব্যাংক ডাকাতির পরিকল্পনা করে স্কুলছাত্র

0
131

রূপালি ব্যাংক ডাকাতির ডাকাতকে খুঁজতে গিয়ে পুলিশ আবিষ্কার করেছে এই কিশোরকে ছেলেটির নাম কৌশিক, সে যেমন সুন্দর দেখতে, তেমন সে মেধাবী। দু: সাহসিক কাজের নেশা তার দারুণ । আধুনিক সব বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে তার মাথায় রয়েছে সব অসম্ভব জাদুকরী জ্ঞান । তার সব কাজ শুনলে সাধারণ মানুষ অসম্ভব ভাববে । তার কাহিনি জেনে দুনিয়াকে হতে হবে অবাক ! বিভিন্ন বড় বড় সাইবার অপরাধীর দুনিয়ার সঙ্গে রয়েছে তার বন্ধুত্ব,কিন্তু কিভাবে ১ জন ১৬ বছরের কিশোর করলো এই কাজগুলো? Facebook Id ভুয়া ৫২টি আর E-mail Id ২২টি রয়েছে যা দিয়ে বিভিন্ন ভাবে নিয়ন্ত্রিত তার অপরাধের নেটওয়ার্ক । আর Dark Web জগতের নিষিদ্ধ সাইটগুলোও তার খুব ভালো ভাবে চেনা। White Devil নামের হ্যাকিং গ্রুপের চালাক এই সদস্য বগুড়া শহরের বিস্ময়কর ১৬ বছরের একটি ছেলে ! বগুড়ার গাবতলির রূপালি ব্যাংক ডাকাতির ডাকাতকে খুঁজতে গিয়ে পুলিশ আবিষ্কার করেছে এই কিশোরকে।


গাজীপুরের টঙ্গীর নিশাত নগর থেকে ব্যাংক ডাকাতির ২ সপ্তাহ পর ২২ জানুয়ারি ভোরে ওই কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া কৌশিকের (কালের কণ্ঠ’র সম্পাদকীয় নীতি অনুযায়ী প্রকৃত নাম ব্যবহার করা হয়নি) বয়স মাত্র ১৬ বছর। পরে তাকে গাবতলীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নেওয়া হয়। সেখানে সে স্বীকার করেন এবং জবান বন্দিতে আসে এমন সব তথ্য যা জেনে শুধু অবাক নন, হুমড়ি খেয়েছেন বগুড়া পুলিশের অপরাধ বিশেষজ্ঞরাও। পরে তাকে কারাগারে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। কৌশিকের দু: সাহসিক কাজের অংশ ছিল বগুড়ার গাবতলীর ব্যাংক ডাকাতি।বিভিন্ন উচ্চ-মানের রঙিন স্পট ও রঙের চাক্ষুষ প্রভাব এ তৈরি বলিউডের ছবি ‘ধুম-৩’ গুনে গুনে ১৫৪ বার দেখে, এবং নিজেকে প্রস্তুত করে এই ব্যাংক ডাকাতির জন্য । বলিউডের ছবি ‘ধুম-৩’ দেখেই আগ্রহী হয়ে উঠে ১৬ বছরের স্কুলছাত্র কৌশিক এবং ব্যাংকে ডাকাতির পরিকল্পনা করে । এই ছবি দেখেই তার মনে ইচ্ছে হয় সাইবার অপরাধে জড়ানোর এবং সাহস পায় ব্যাংক ডাকাতির মত ঝুঁকিপূর্ণ দু: সাহসিক কাজের । পরে ব্যাংক ডাকাতির সময় দুই আনসার সদস্যকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে এ তথ্য জানিয়েছেন বগুড়া ডিবি পুলিশের ওসি আব্দুর রাজ্জাক। কৌশিক ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড এবং রাজশাহী বিভাগের সেরা স্কাউটের খেতাব পায় । বগুড়া শহরের নিউ মার্কেট এলাকার ব্যবসায়ী তার বাবা । তার বাড়ি শহরতলীর মাটিডালি এলাকায়। তার বড় বোনের বাড়ি বগুড়ার গাবতলীতে সেখানে সে বোনের বাড়িতে থাকা অবস্থায় ব্যাংকে ডাকাতির চিন্তা মাথায় আসে তার। ডাকাতির সময় সে ছুরির আঘাত ও জ্বলন্ত পদার্থ ছুড়ে দুই আনসার রক্ষীকে আহত করে রূপালী ব্যাংকের একটি শাখায় ডাকাতির চেষ্টা করে এই কৌশিক। মুখোশ পরা অবস্থায় তার নিক্ষিপ্ত জ্বলন্ত পদার্থ ও ছুরির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হন দুই আনসার সদস্য। ঘটনার দিন ভোরে সে মুখোশ এবং হাতে বিশেষ রুফটপ গ্লভস হাতে পরে প্রথমে ছাদে ওঠেন। স্পাইডারম্যানের মতো দেয়ালে উঠতে পারে এই গ্লভস ব্যবহার করলে কোন কিছু আর ব্যবহার করতে হয় না । কৌশিক এরপর ছাদের সিঁড়িঘরের তালা কাটার দিয়ে কেটে ভেতরে ঢোকে । সবশেষে ব্যাংকের ভেতরের ভল্ট ভাঙার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় সে। সে Information of Technology তে ভালো দক্ষতা আছে। তাকে কারাগারে রাখা হয়েছে। তাকে যশোরের কিশোর শোধনাগারে পাঠানো হবে। এই কথা বগুড়ার ডিবি পুলিশ ওসি আব্দুর রাজ্জাক বলেন। জানা গেছে, dark web এর সাথে খুব ভালো পরিচিতি ছিল কৌশিকের। ওই ওয়েবে White Devil নামে একটি হ্যাকিং গ্রুপের মাধ্যমে বিশ্বের শীর্ষ অপরাধীদের খাতায় নাম লেখানোই ছিল কৌশিকের ইচ্ছা। এই ইচ্ছার কারণেই সে একটি আন্তর্জাতিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে রাশিয়া থেকে চাহিদা দিয়ে এনেছিল পারক্লোরিক এসিড, ক্লোরোফম, এডিনল ইথানল ও পটাশিয়াম ডাইক্লোরেট নামের বিভিন্ন ভীতিকর রাসায়নিক পদার্থ। নিজের বাড়িতে বসে সে তার ব্যক্তিগত ল্যাবে এসব নিয়ে গবেষণা চালাতো। কৌশিক পুলিশকে জানায়, সে Dark Web থেকে নেওয়া অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ব্যাংক ডাকাতির সময় সেখানে পাহারারত আনসারের গায়ে Nitrogen Solution ছুড়ে মারে। এটি তাদের শরীর পুড়ে ফেলে এবং ব্যাংকে প্রচণ্ড ধোঁয়ার সৃষ্টি করে। কৌশিকের নিজের ল্যাবে কাঁদানে গ্যাসের মতো এসিডও তৈরি করেছেন। সে ডাকাতির সময় ব্যাংকের দেয়াল ও মেঝে পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ার জন্য এসিটোন আল অ্যালকাইন সলিউশন ঢেলে দেয়। কৌশিকের নিউক্লিয়ার সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনার ঝোঁক ছিল । নিষিদ্ধ এসব বই ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে সে সংগ্রহ করে। La diaga, the sunshine USA, Brittanica, The unknown, The versa, Critix বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল । বিভিন্ন জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশদের কৌশিক জানায়, রাশিয়ান ভাষা শিখতে হয়েছে তাকে নিউক্লিয়ার সায়েন্সের ওপর পড়াশোনা করতে গিয়ে, সেই সঙ্গে সে থিসিস নোট লিখত নিউক্লিয়ার বোমা তৈরির জন্য এই নোট গুলো ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে জমা দিত কৌশিক । তার ১ টি ২৩ পাতার Article ও ৩ পাতার design ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৮০০০ ইউ এস ডলারে বিক্রি হয়। যা বর্তমান বাজারে সাড়ে সাত লাখের কিছু বেশি বাংলাদেশি টাকায় । তার মায়ের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশের একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে কৌশিক এই টাকাগুলো তুলে নেয়। এরপর Dark Web এর মাধ্যমেই আরো কিছু থিসিস নোট নেওয়ার চাহিদা আসে । ডার্ক ওয়েবের থিসিস নোট থেকে পাওয়া টাকার পুরোটাই সে ব্যয় করে অসৎ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। সাইবার ক্রাইমদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটিয়েছে শুধুমাত্র এই সম্পর্কে জানার জন্য । কৌশিক জানায় পুলিশকে , সেনা সৈনিকদের মতোই নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম সে, মাত্র ত্রিশ মিনিটের মধ্যে এসির কনভার্টার রিম দিয়ে তৈরি করতে পারে বিপজ্জনক দোনলা বন্দুক। একই সঙ্গে এসির কমপ্রেশারের গ্যাস দিয়ে তৈরি করতে পারে অজ্ঞান গ্যাস। এই গ্যাস স্প্রে করলে যে কেউ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অজ্ঞান হবে। কৌশিকের আরো একটি আশ্চর্য আবিষ্কার হলো বিভিন্ন কেমিক্যাল মিশ্রিত Instant Fire। এটি তরল পদার্থ, যা দিয়ে মাটি, বালি, পানি, ইট রডসহ যেকোনো জিনিসের উপর আগুন জ্বালানো যায়। এই Instant Fire ব্যবহার করে সেই ব্যাংকে সে ২ বা ৩ মাস আগেও আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করেছিল।
‘ছেলেটির কীর্তিতে সত্যিই আমরা অবাক!এই বয়সে এত বড় বড় অপরাধ পরিকল্পনা এটা বিশ্বাস করা যায় না’ কৌশিক সম্পর্কে আলী আশরাফ ভূঞা বগুড়ার পুলিশ সুপার বলেন। তিনি আরও বলেন, তাকে ধরতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে বগুড়া পুলিশের বিশেষ দলকে । ১৮ দিন চেষ্টার পর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলী হায়দার চৌধুরীর নেতৃত্বে গাবতলী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আনোয়ার হোসেন তাকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। পুলিশ জানায়, একজন পেশাদার অপরাধীর চেয়েও পদক্ষেপ বেশি নিয়েছিল কৌশিক। পিঠে ব্যাথা পাওয়ার কারণে ডাকাতিতে ব্যর্থ হয়েছিল, পরে সে বগুড়া শহরে এসে তার এক বন্ধুর বাড়িতে আসে। সেখানে সে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নাম পালটিয়ে চিকিৎসা নেয়। এরপর বাসে করে পালিয়ে চলে যায় গাজীপুরের টঙ্গীতে তার চাচার বাসায়। সেখানে সব অনলাইন যোগাযোগ বন্ধ রেখে গোপনে ই-পাসপোর্ট করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু প্রতি রাতে তার এক মেয়ে বন্ধুর সঙ্গে চ্যাটিং তাকে ধরিয়ে দেয়। শুধু এই একটি সূত্র ধরে পুলিশ এই ভয়ংকর বালককে গ্রেপ্তারে সক্ষম হয়। গ্রেপ্তারের পর তার পরিবারের কেউ পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। গত শুক্রবার ভোরে গ্রেপ্তারের পর ওই দিন সন্ধ্যায় কৌশিককে হাজির করা হয় বগুড়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসমা মাহমুদের আদালতে। সেখানে সব ঘটনা স্বীকার করে সে এবং ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় । পরে তাকে জেলখানায় পাঠানো হয়। পুলিশ জানায়, বয়স ছোটর কারণে কৌশিককে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হতে পারে। কৌশিকের মা-বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা জানান, ছেলে মেধাবী হলেও তাঁদের কথা শোনে না। তাঁরা ছেলের অপরাধের ব্যাপারে আর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here